প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তরুণদের গ্রাস করছে ই-সিগারেট

ডেস্ক রিপোর্ট  : ই-সিগারেটে গ্রাস করছে তরুণ সমাজকে। আর এতে উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্টস (ভ্যাপিং, ই-সিগারেট) এর আবির্ভাবের পর থেকে বিশ্বব্যাপী তামাক ব্যবহারের পদ্ধতি ও ব্যবহার, বিপণন কৌশল, তামাকাসক্তি সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং তামাক ব্যবহারজনিত মৃত্যু প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কৌশলী প্রচার-প্রচারণার কারণে এসব পণ্যের জনপ্রিয়তা এবং ব্যবহার বর্তমানে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিমধ্যে অনেক দেশ ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং পণ্য নিষিদ্ধ করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বাজারে মোট দুই ধরনের ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট পাওয়া যায়। ইলেক্ট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম্‌স এবং হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট। ইলেক্ট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম্‌স- এক ধরনের ব্যাটারিচালিত ডিভাইস যা ই-লিক্যুইড বা নিকোটিনযুক্ত তরল দ্রবণকে তাপের মাধ্যমে বাষ্পে রূপান্তরিত করে। একজন ব্যবহারকারী যখন ডিভাইসটিতে টান দেয়, তখন নিকোটিনের দ্রবণ গরমে বাষ্পীভূত হয় এবং ব্যবহারকারীকে নিকোটিন সরবরাহ করে।

এতে নিকোটিন ছাড়াও নানারকম রাসায়নিক মিশ্রণ এবং সুগন্ধি মেশানো থাকে, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ইলেক্ট্রনিক সিগারেট বা ই-সিগারেট, ভ্যাপ বা ভ্যাপ পেনস্‌, ই-হুক্কা, ই-পাইপ এবং ই-সিগার প্রভৃতি এন্ডস্‌ পণ্যের বিভিন্ন ধরন। সাধারণ সিগারেট বা পাইপ আকৃতি ছাড়াও এগুলো দেখতে কলম, পেনড্রাইভ, বিভিন্ন খেলনা কিংবা সিলিন্ডার আকৃতির হয়ে থাকে।

হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট-ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসভিত্তিক এক ধরনের তামাক পণ্য। তামাকযুক্ত স্টিক বা প্লাগ থেকে তাপ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিকোটিন এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত ধোঁয়া গ্রহণ করা হয়। এতে তামাকের সঙ্গে অন্যান্য রাসায়নিক এবং সুগন্ধি মেশানো হয়। ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ই-সিগারেটকে সুনিশ্চিতভাবে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউএস সার্জন জেনারেল রিপোর্ট ২০১৬-এ ই-সিগারেটসহ নিকোটিনযুক্ত সকল পণ্যকে ‘অনিরাপদ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৯ সালে ভ্যাপিং-সৃষ্ট শ্বাসযন্ত্রের জটিলতা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে মহামারির আকার ধারণ করলে এই ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্টসগুলোর সত্যিকারের চেহারা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৩ই নভেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত দেশটির ২,১৭২ জনের ফুসফুসজনিত রোগ এবং ৪২ জনের মৃত্যুর সঙ্গে ই-সিগারেট/ভ্যাপিংয়ের যোগসূত্র থাকার কথা নিশ্চিত করেছে।

ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট অর্থাৎ ইলেক্ট্রনিক সিগারেট, ভ্যাপিং, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট (এইচটিপি) ইত্যাদি নতুন প্রজন্মের তামাকপণ্য প্রথাগত সিগারেটের মতোই ক্ষতিকর হিসেবে স্বীকৃত হলেও তামাক কোম্পানিগুলো এসব পণ্যকে সিগারেটের ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে বাজারজাত করছে এবং নীতি নির্ধারকদের সামনেও সেভাবেই উপস্থাপন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মূলত তরুণ এবং শিশুদের টার্গেট করে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এসব পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করছে তামাক কোম্পানিগুলো। উদ্ভাবনী কৌশল এবং আকর্ষণীয় ডিজাইনের কারণে কিশোর এবং তরুণদের মাঝে বিশেষত বিদ্যালয়গামী শিশুদের মধ্যে এসব তামাকপণ্য জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করেছে। ইউরোপ, আমেরিকা সহ বেশ কিছু দেশে এসব পণ্য ব্যবহার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে মাত্র ১ বছরের ব্যবধানে আমেরিকায় স্কুল পড়ুয়া তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট ব্যবহার ৭৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভ্যাপিং এবং ই-সিগারেটের ব্যবহার পূর্ব ও পশ্চিমের দেশগুলোর মধ্যে বেশি হলেও বাংলাদেশও ঝুঁকিমুক্ত নয়। দেশে ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট এর ব্যবহার তরুণ এবং যুব সমাজের মধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাস্তাঘাট, ক্যাম্পাস, তরুণদের আড্ডাস্থল এমনকি বিভিন্ন মার্কেট এবং রাস্তার মোড়ে গড়ে ওঠা ভ্যাপিং ক্লাবে এসব পণ্যের ব্যবহার উদ্বেগজনকহারে চোখে পড়ছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বিক্রয় কেন্দ্র। অনলাইন এবং ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ই-সিগারেট সামগ্রী নিয়ে আলোচনা, বিক্রয় ও হাতবদল হচ্ছে। তবে এসব পণ্য ব্যবহারের মাত্রা কতটা বিস্তার লাভ করেছে সে বিষয়ে সবশেষ কোন গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত নেই। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (এঅঞঝ) ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠির মধ্যে পরিচালিত হয় বলে এই গবেষণার মাধ্যমে ইমার্জিং টোবাকো প্রোডাক্ট ব্যবহারে প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০১৭ সালে পরিচালিত এঅঞঝ অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠির মধ্যে ই-সিগারেট ব্যবহারের হার ০.২ শতাংশ।

সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠির ৪৯ শতাংশই তরুণ, যাদের বয়স ২৪ বছর বা তার নিচে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট সময়কাল অতিবাহিত করছে যেখানে, নির্ভরশীল জনগোষ্ঠির তুলনায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠির সংখ্যা বেশি। এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ বছর দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। একটি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং ইতিবাচক পরিবর্তনে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট জনগোষ্ঠির অবদান অতি গুরুত্বপূর্ণ।

৪৯ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠির ওপর নির্ভর করে তামাক কোম্পানি চায়-এই তরুণ জনগোষ্ঠিকে যেকোন উপায়ে তামাকপণ্য ও ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট এ আসক্ত করে নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং মুনাফা বৃদ্ধি করা; ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট অর্থাৎ ইলেক্ট্রনিক সিগারেট, ভ্যাপিং, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ইত্যাদিকে সিগারেটের ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে ভোক্তা এবং নীতিনির্ধারকদের সামনে উপস্থাপন করা; নতুন পুঁজি বিনিয়োগ করে নিত্যনতুন পণ্য বাজারজাত করা।২০৪০ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার ‘তামাকমুক্ত বাংলাদেশ’ অর্জন।

তামাক বিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা) বলেছে, ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ও ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাংলাদেশের তরুণ ও যুব সমাজকে রক্ষা করতে ই-সিগারেটসহ সকল ভ্যাপিং এবং হিটেড তামাকপণ্যের উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এছাড়াও নিয়মিত মনিটরিং এবং জরিপ/গবেষণার মাধ্যমে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা করতে হবে। ইতিমধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ই-সিগারেট নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এছাড়াও শ্রীলঙ্কা, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ ৩০টির অধিক দেশ এসব পণ্য নিষিদ্ধ করেছে। সুতরাং তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনে এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ ই-সিগারেটের বিরোধীতা করে বলেন, এগুলো তরুণ সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এদিকে আমাদের নজর দিতে হবে।

উৎসঃ মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত